Saturday, November 7, 2009

কোকিলের বাসা


বাবা-মার মধ্যে একধরণের হিউম্যানিজম ছিলো।(যার কথা ভাবলে এখনো খুব বিস্মিত হই।) ফলে বাড়িতে মাকে সাহাস্যকারী মেয়েগুলোকে আমরা বাইরের মানুষ ভাবিনি কোনোদিন। শিখা বলে একটি মেয়ে ছিল, কণিকার সাথে স্কুলে যেতো, একই ক্লাসে পড়ত। মা রাতে দুজনকেই নিয়ে পড়াতে বসত। আমাদের রাতে ঘুম না পেলে গেস্টরুমে শিখার খাটে গিয়ে গল্প করতে করতে ঘুমিয়ে যেতাম। মাঝে মাঝে একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যেতো, যখন কাজগুলো আমাদের তিনজনকেই ভাগ করে দেয়া হতো। আমাদের দুই বোনের এই নিয়ে খুব রাগ ছিল---আমরা কেন বাসন মাজবো, জল তুলে আনব খাল থেকে! ও আনবে! ও তো কাজের মেয়ে, আমরা তো না!'

বাড়িতে নানান ধরণের প্রেমপত্র আসতো। কিশোরী মেয়ে থাকলে যা হয়! আমরা দুইবোন আবার এগুলো সব বাবাকে দিয়ে দিতাম! রাতে ডাইনিং টেবিলে বসে বাবা নাটকের মত করে পড়ে পড়ে শনাতেন! আমরা হাসতে হাসতে বিষম খেতাম! সে এক দারুণ দিন ছিলো আমাদের। শিখার কাছে একবার প্রেম পত্র এলো, সে অচিরেই লুকিয়ে ফেলল সেই পত্র। তারপর, সে যখন তখন নানান কাজের আছিলায় বাইরে যায়, ফেরে ঘন্টা চারেক পরে...।
এরকম হতে হতে একদিন এক ভদ্রলোক আমাদের বাড়িতে আসলেন...বাবাকে বলেন...আপনার ভাগ্নীকে বিয়া করার জন্যে আমার ছেলে তো পাগল হইছে...আমরা সবাই অবাক...আমাদের দিদি তো সেই কবে থেকে দমদম এ থাকে বড়দাদার সাথে। বাবা বললে, আমার ভাগ্নী তো দাদা, কোলকাতায় থাকে।' ভদ্রলোক বলেন...তাহলে শিখা কি আপনার ভাগ্নী নয়? বাবা এবার ঘটনা বুঝে নেন, বলেন, 'ও। ও তো আসলে আমার দুর্সম্পর্কের বোনের মেয়ে... শিখার বিয়ে ঠিক হয়, আমার থেকে সে বয়সে ছোট, মাত্র চৌদ্দ বছর বয়স, অথচ সেই বিয়ের কথায় তার আচার আচরণ সব পালটে যায়, বুড়ীদের মত কথা বলতে শুরু করে সে, যখন তখন উপদেশ...কণিকা বলে,'তুই তো তোর বরকে মিথ্যে বলে প্রেম করেছিস, বিয়ে হলে সত্য বলে দিস।' সাহসী মেয়ে বলে,' কেন, আমি তোদের বোন হতে পারি না? গরীবের মেয়ে বলে কি আমার ভালো ঘরে বিয়ে হতে পারে না?'

গরীবের মেয়ের ভালো ঘরে বিয়ে হয়, কিন্তু পড়াশুনা বন্ধ হয়ে যায়। মা বার বার ওর স্বাশুড়ীকে বলে মাধ্যমিক দেবার ব্যবস্থা করে দিতে-না হয় আমাদের বাড়িতে এসে ওই সময়টায় থেকে পরীক্ষাটা দিয়ে দেবে। মেয়েটি পড়াশুনায় তো অনেক ভালো। ক্লাসে প্রথম ৫ জনের মধ্যে থাকত- আর ওর হাতের লেখা যে কী সুন্দর ছিলো! শিখা একদিন চলে আসে আমাদের বাড়িতে, বলে ,' আমি আর না যাই মামী? আমি এইখানে থাকি?'
মা ওকে বুঝিইয়ে ফেরৎ পাঠান। একদিন কণিকার মাধ্যমিক এর রেজাল্ট আসে, যশোর বোর্ডের প্রথম দশ জনের মাঝে সে একজন- শিখা শুনে তার হাতের চুড়ি খুলে দিয়ে যায় ওর জন্যে। যাওয়ার সময় খুব কাঁদে।

চৌদ্দবছর পরে সেদিন বাড়ি গেলাম...শিখা আমাকে দেখতে এসেছে। ওর যে কয়টা ছেলেমেয়ে আমি ঠিক গুনতে পারলাম না। জিজ্ঞেসও করিনি। আমার জন্যে একটি কবিতা লিখে নিয়ে এসেছে- সেই সুন্দর হাতের লেখা। মনে পড়ে গেলো, ছেলেবেলায় আমরা তিনজন মিলে বারান্দার বসে রুলটানা খাতায় কবিতা লিখতাম-
ঃ আমাদের মনে কতো আশা,
পেয়ারা গাছের ডালে, দিনে দিনে কালে কালে
এই ভেবে কাক বাঁধে কোকিলের বাসা!

No comments:

Post a Comment