Friday, November 20, 2009

নিজের কথা-৩


গত সপ্তাহে পড়ে শেষ করলাম 'বায়োগ্রাফি অফ আ গেইসা' বইটা। এর আগে কেন পড়িনি সেই প্রশ্নের জবাব হবে না। বইটির রিভিউ পড়ে ২০০৬ এ রাজার জন্মদিনে দিয়েছিলাম। তখন আমি জাপানে, ও ক্যানাডায় এসেছে ম্যাকগিল এ পোস্ট ডক্টরেট করতে। আমার কাছে ঋত, ৪ মাস বয়স, আমরা মা-মেয়ে একটি ছোট্ট ফ্ল্যাট এ থাকি, ছোটো একটি টিভিতে সময় নেই অসময় নেই বাচ্চাদের কার্টুন দেখি, বিকেলে দুজনে ঘুরতে যাই; একজন স্ট্রলার এ শুয়ে থেকে আকাশ দেখে, অন্যজন তার সাথে বকে যায় সে বুঝলো কি-না তার পরোয়া না করেই। আমি তখন সামলাতে পারিনে বলে স্কুলের মাস্টারী ছেড়ে দিয়েছি, মাঝে মাঝে কমিউনিটি সেন্টারে দুই-একটা ক্লাস নেই, ওদের ডে কেয়ারে ঋত কে রেখে। সকালে বুকে ঋত কে ঝুলিয়ে, দুইহাতের একহাতে গমি(ময়লা) ব্যাগ, অন্য হাতে জলের জার নিয়ে আমি বেরোই, ফিরি বুকে ঋতকে ঝুলিয়ে, একহাতে ৫ লিটার জল, অন্য হাতে বাজায় নিয়ে। সিড়ি ভেঙ্গে উঠি, অদ্ধেক উঠে আমার সারা শরীর ভেঙে যেতে চায়, আমার কান্না পায়; কাঁদতে গিয়ে দেখি একজন আমার মুখের দিকে তাকিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে নিস্পাপ ও সুন্দর হাসিটি হেসে যাচ্ছে! আমি সব ভুলে যাই, আমার ক্লান্ত শরীর আবার শক্তি ফিরে পায়। তখন আমার মাঝে মাঝেই মনে হতো ওর বাবা কাছে থাকলে মেয়েকে কত জায়গায় নিয়ে যেত, কত অভিজ্ঞতা যুক্ত হতো তার অইটুকু ছোটো জীবনে! আমিও চেষ্টা করি, সপ্তাহে একদিন আমরা যাই "ওকাহসান তো কোদোমো' (মা ও শিশু) আলয়ে। সেখানে ব্যব্য্য়াম করি, ছড়া শিখি, খেলি।আমাদের সময় ভালো কাটে। তখন আমি ফুকুওকা শহরের কোথায় কোথায় বই পড়ার আসর হয় সব খুঁজে বেড় করেছিলাম। জেডা, আমাকে খুব সাহায্য করেছিল। আমরা দুই মা-মেয়ে মিলে বাসে করে যেতাম বই পড়তে। সেই থেকে ঋত এর সবচেয়ে প্রিয় জিনিস হলো বই!

রাতে যখন ও ঘুমিয়ে যেতো, আমি খুব শব্দে টিভি চালিয়ে রাখতাম। আমার ফ্ল্যাটের দুইপাশে থাকতো দুই ব্যচেলর। তাদের ঘরে সারারাত হৈ হুল্লোর, মাঝে মাঝে প্রেমের-শীৎকারের অদ্ভুত কাতরানি, আমার ভয় করতো! অধিকাংশ রাতেই আমি ঘুমাইনি। তখন আমার আর ক্যানাডা গভঃ এর ওপর কোনো অভিযোগ নেই আমার ১ মাসের বাচ্চাকে ভিসা দেয়নি বলে। অনেকেই বলেছে এটা ওদের চামড়া দেখে মানুষ বিভাজুন করার কারণে হয়েছে। আমি কোনোদিন বিশ্বাস করিনি। আজও করতে চাই না। মানুষের ওপর থেকে বিস্বাস হারিয়ে নিজের কাছে নিজে অসহায় হতে চাই না কোনোদিন!

এই বইটা সবসময় আমাকে ওই সময়টার কথা মনে করিয়ে দ্যায়!

Saturday, November 7, 2009

কোকিলের বাসা


বাবা-মার মধ্যে একধরণের হিউম্যানিজম ছিলো।(যার কথা ভাবলে এখনো খুব বিস্মিত হই।) ফলে বাড়িতে মাকে সাহাস্যকারী মেয়েগুলোকে আমরা বাইরের মানুষ ভাবিনি কোনোদিন। শিখা বলে একটি মেয়ে ছিল, কণিকার সাথে স্কুলে যেতো, একই ক্লাসে পড়ত। মা রাতে দুজনকেই নিয়ে পড়াতে বসত। আমাদের রাতে ঘুম না পেলে গেস্টরুমে শিখার খাটে গিয়ে গল্প করতে করতে ঘুমিয়ে যেতাম। মাঝে মাঝে একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যেতো, যখন কাজগুলো আমাদের তিনজনকেই ভাগ করে দেয়া হতো। আমাদের দুই বোনের এই নিয়ে খুব রাগ ছিল---আমরা কেন বাসন মাজবো, জল তুলে আনব খাল থেকে! ও আনবে! ও তো কাজের মেয়ে, আমরা তো না!'

বাড়িতে নানান ধরণের প্রেমপত্র আসতো। কিশোরী মেয়ে থাকলে যা হয়! আমরা দুইবোন আবার এগুলো সব বাবাকে দিয়ে দিতাম! রাতে ডাইনিং টেবিলে বসে বাবা নাটকের মত করে পড়ে পড়ে শনাতেন! আমরা হাসতে হাসতে বিষম খেতাম! সে এক দারুণ দিন ছিলো আমাদের। শিখার কাছে একবার প্রেম পত্র এলো, সে অচিরেই লুকিয়ে ফেলল সেই পত্র। তারপর, সে যখন তখন নানান কাজের আছিলায় বাইরে যায়, ফেরে ঘন্টা চারেক পরে...।
এরকম হতে হতে একদিন এক ভদ্রলোক আমাদের বাড়িতে আসলেন...বাবাকে বলেন...আপনার ভাগ্নীকে বিয়া করার জন্যে আমার ছেলে তো পাগল হইছে...আমরা সবাই অবাক...আমাদের দিদি তো সেই কবে থেকে দমদম এ থাকে বড়দাদার সাথে। বাবা বললে, আমার ভাগ্নী তো দাদা, কোলকাতায় থাকে।' ভদ্রলোক বলেন...তাহলে শিখা কি আপনার ভাগ্নী নয়? বাবা এবার ঘটনা বুঝে নেন, বলেন, 'ও। ও তো আসলে আমার দুর্সম্পর্কের বোনের মেয়ে... শিখার বিয়ে ঠিক হয়, আমার থেকে সে বয়সে ছোট, মাত্র চৌদ্দ বছর বয়স, অথচ সেই বিয়ের কথায় তার আচার আচরণ সব পালটে যায়, বুড়ীদের মত কথা বলতে শুরু করে সে, যখন তখন উপদেশ...কণিকা বলে,'তুই তো তোর বরকে মিথ্যে বলে প্রেম করেছিস, বিয়ে হলে সত্য বলে দিস।' সাহসী মেয়ে বলে,' কেন, আমি তোদের বোন হতে পারি না? গরীবের মেয়ে বলে কি আমার ভালো ঘরে বিয়ে হতে পারে না?'

গরীবের মেয়ের ভালো ঘরে বিয়ে হয়, কিন্তু পড়াশুনা বন্ধ হয়ে যায়। মা বার বার ওর স্বাশুড়ীকে বলে মাধ্যমিক দেবার ব্যবস্থা করে দিতে-না হয় আমাদের বাড়িতে এসে ওই সময়টায় থেকে পরীক্ষাটা দিয়ে দেবে। মেয়েটি পড়াশুনায় তো অনেক ভালো। ক্লাসে প্রথম ৫ জনের মধ্যে থাকত- আর ওর হাতের লেখা যে কী সুন্দর ছিলো! শিখা একদিন চলে আসে আমাদের বাড়িতে, বলে ,' আমি আর না যাই মামী? আমি এইখানে থাকি?'
মা ওকে বুঝিইয়ে ফেরৎ পাঠান। একদিন কণিকার মাধ্যমিক এর রেজাল্ট আসে, যশোর বোর্ডের প্রথম দশ জনের মাঝে সে একজন- শিখা শুনে তার হাতের চুড়ি খুলে দিয়ে যায় ওর জন্যে। যাওয়ার সময় খুব কাঁদে।

চৌদ্দবছর পরে সেদিন বাড়ি গেলাম...শিখা আমাকে দেখতে এসেছে। ওর যে কয়টা ছেলেমেয়ে আমি ঠিক গুনতে পারলাম না। জিজ্ঞেসও করিনি। আমার জন্যে একটি কবিতা লিখে নিয়ে এসেছে- সেই সুন্দর হাতের লেখা। মনে পড়ে গেলো, ছেলেবেলায় আমরা তিনজন মিলে বারান্দার বসে রুলটানা খাতায় কবিতা লিখতাম-
ঃ আমাদের মনে কতো আশা,
পেয়ারা গাছের ডালে, দিনে দিনে কালে কালে
এই ভেবে কাক বাঁধে কোকিলের বাসা!

Friday, November 6, 2009

বন্ধুত্ব

আমার এক বন্ধু আছেন-মাঝে মাঝে সুখ-দুঃখের কথা বলি তার সাথে। তাকে কেন যেন আমার বর আবার দুই চক্ষে দেখতে পারে না। ফোন আসলেই সামনে গিয়ে দাঁড়াবে,'তোমার সাথে জরুরী কথা আছে...' অতএব ফোন রেখে দিতে হয়। আমি বলি,'এইগুলো কর কেন?' সে বলে,"' বুড়ার সাথে এত কিসের কথা?'আমি বলি,' তোমায় নিয়ে আর পারিনা!" কিন্তু মনে জেগে থাকে যে আমি চাইলেই কারো সাথে কথা বলতে আর পারি না, অন্য কারোর ইচ্ছা অনিচ্ছা নিয়ে আমাকে ভাবতে হয়...এটি যদি আজ থেকে ১০ বছর আগের ঘটনা হতো, আমি হয়ত খুশীই হতাম, এই ভেবে যে আমায় সে এতই ভালবাসে যে অন্য কারো সাথে কথা বললে তার ঈর্ষা হয়! কিন্তু আস্তে আস্তে যতই মানুষের সূক্ষ্ম অনুভূতির জগৎকে জানছি, মনে হচ্ছে যা দেখা যাচ্ছে তার বাইরেও কিছু রয়েছে। যা কিনা আমি জানি্না। ।আর এই না জানাটা ভালো।
আমার এই বিশেষ বন্ধুটির সাথে আমার কী এমন কথা হয়! বড়ই জটিল প্রশ্ন; ইনি রাশিফল এ বিশ্বাস করেন, আর আমার আর তাঁর রাশি একই, তাই এঁর ধারণা ইনি আমায় বুঝতে পারেন। আমি রাশিফলে বিশ্বাস করিনা, কিন্তু যাদবপুরে থাকার সময় এই বিষয় নিয়ে জ্বালিয়াতি করে প্রায় সব হষ্টেল্বাসিনীদের গোপন খবর জেনে গেছিলাম... কে কোথায় লাইন লাগাচ্ছে, কে কার বয়ফ্রেন্ড ভাগাবার তালে আছে, কে পরীক্ষা ফেল করার সমূহ সম্ভাবনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে ইত্যাদি সব আমি জানতাম।রাশিফলের ওপর প্রচুর পড়াশুনা আমার তখন করা ছিল। কিন্তু, আমি যেমন আমার বন্ধুটিকে বলি যে, মানুষকে তার জন্ম তারিখ দিয়ে হয়ত কিছুটা পড়া যেতে পারে, কিন্তু বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দিয়ে তার থেকে অনেক বেশী পড়া সম্ভব। একটা মানুষ কেমন করে হাঁটে, কেমন করে কোলের ওপর হাত দুটি রাখে, কীভাবে তাকায়, কীভাবে অধস্তনদের সাথে কথা বলে, কীভাবে হাসে...এসব দিয়ে তাকে অনেক বেশী পড়া যায়...। আমি তাকে মাঝে মাঝেই বলি যে, যে কাউকে আপনি পজিটিভ কথা দিয়ে শুরু করুণ, তারপ্পর সাধারণ গুনাবলী দিয়ে চালান, তারপর কিছুটা বলুন তাদের নেগেটিভ ব্যপারগুলো নিয়ে( যেগুলো আসলে তেমন সিরিয়াস কিছু না) দেখবেন সে ধরেই নেবে আপনি বিরাট গণক।

এছাড়া এই বন্ধুর সাথে আমার অন্য আরেকজন বিশেষ মানুষকে নিয়ে কথা হয়। তারঁ একমাত্র কন্যা, যে কিনা আমারই বয়সী। ভদ্রলোক বছরে একবারই দেশে যান, তখন মেয়ের সাথে দেখা হয়! উনি যে আমাকে মেয়ের মতন ভাবেন, বিষয় কিন্তু তা-ও না। আমাদের বন্ধুত্বে বয়স একটি অবহেলিত বিষয়...আর তা নিয়েই আমার বরের যত অস্বস্তি! আমাকে তার কন্যার স্থানে বসাতে পারলে ও বোধহয় খুব শান্তি পেত। কিন্তু এইসব আত্মীয় পাতানোতে আমার এলার্জি আছে। সম্পর্কের মধ্যে এসব না নিয়ে এলে কি সম্পর্ক সরল এবং স্বচ্ছ হতে পারে না? নিশ্চই পারে। কিন্তু আমাদের মাথায় আবর্জনার মত অদ্ভুত সব গাঞ্জা ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে, কোনটা ডিসেন্ট কোনটা নয় এইসব। আমি বলি , আমার মন যাকে সুন্দর বলে আমি তাকেই সুন্দর বলে মানব, সবাই মিলে তাকে কদর্য বললে আমার কিছুই যায় আসে না। আর আমার মন যাকে মলিন বলবে, তোমরা হাজার তাকে সতেজ বল, আমি বলব না। আমার মন বা বিবেককে আমি সবথেকে বিশ্বাসযোগ্য বলে মানি। কারণ মেনে কোনোদিন ঠকিনি!

Sunday, November 1, 2009

নিজের কথা-২

ঋত্বিকা স্কুল থেকে ফিরে সাধারণ একটি প্রশ্ন করেছে," মা, যশোয়ার দুইটা মাম্মি, ওর কোনো ড্যাডি নেই ক্যানো?'
আমি স্বভাব্বশতঃ এদিক ওদিক দেখি, তারপর বলি,'সবার যে একজন মাম্মি ও একজন ড্যাডি থাকবে সেরকম কোনো নিয়ম তো নেই; দুজন মাম্মি থাকতেই পারে। তাতে কি ওর কোনো অসুবিধে আছে বলেছে?'
মেয়ে বলে ,'না! he is just happy about it!"
আমি বলি,'ওর অসুবিধা না থাকলে তো ঠিকি আছে।'
আমার মেয়ে বলে,'হুম, বুঝেছি!"
জানি, ওকে এই বিষয়ে বুঝিয়ে বলার ভাষা ঠিক গুছিয়ে উঠতে আমিও পারিনি। পারিনি, কারণ এই বিষয়টি এখনও আমাদের কাছে স্পর্শকাতর একটি বিষয়। আর তাছাড়া ঋত তার জীবনের মাত্র তৃতীয় বছর পার করছে। এর বেশী কি কিছু আসলে বলা যায় ওকে! কিন্তু আমার মাঝে মাঝেই মনে হয়, যশ যে একটি ভিন্নরকম পরিবার থেকে এসেছে তা এইটুকু শিশু বুঝলো কেমন করে! ওর টিচারকে একদিন জিজ্ঞেস করলাম ব্যপারটি! লেসলী বলল,'ছেলেটি নিজেই এই গল্প করে ক্লাসে।' নিশ্চিন্ত হলাম যে কোনরকম অনভিপ্রেত আলোচনার মাধ্যমে এই কৌতূহল জাগেনি আমার কন্যার মাঝে। সমকামীতা নিয়ে আমি দেখেছি আমার পরিচিত প্রায় অনেকেরই মাঝে এলার্জি টাইপের রয়েছে। অন্য দুজন মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে এই অবাঞ্ছিত আগ্রহ মাঝে মাঝে অবাক করে আমায়। ভাবছি এ নিয়ে পরে আবার লিখে রাখবো।